
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি বলেছে, ভুক্তভোগীরা প্রকৃত ন্যায়বিচার চাইলে মৃত্যুদণ্ড নয়—স্বচ্ছ, পক্ষপাতহীন বিচার ও সত্য প্রকাশের প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
অ্যামনেস্টির ওয়েবসাইটে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে এমন একটি বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার হবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে, কোনোভাবেই মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে নয়। তারা উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হয়তো বিচারের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু এটি ভুক্তভোগীদের জন্য প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার নয়।
অ্যামনেস্টির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, মৃত্যুদণ্ড বরাবরই নিষ্ঠুর ও অমানবিক শাস্তি। এমন গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্য উদঘাটন, দায়ীদের জবাবদিহি ও ক্ষতিপূরণ—এসবই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মূল উপাদান হওয়া উচিত।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানে ১৪০০ জনের বেশি নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন। আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার এবং অল্প সময়ে রায় দেওয়া—এ দুটোতেই ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সময় ছিল না, যা আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
জাতিসংঘ: মৃত্যুদণ্ড সমর্থন নয়
রায় ঘোষণার পর জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, তারা কোন পরিস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করে না। জেনেভায় সংস্থাটির মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি বলেন, এ রায় অবশ্যই জুলাই আন্দোলনের ভুক্তভোগীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, কিন্তু একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড ও অনুপস্থিতিতে বিচার আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ জাতীয় পুনর্মিলনের পথে এগোবে এবং নিরাপত্তা খাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সংস্কার করা হবে।
আইসিজি: শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) রায়কে ‘সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাববাহী’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ পরামর্শক থমাস কিন বলেন, জুলাই–আগস্টের নৃশংসতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিয়ে জনমনে তেমন সন্দেহ নেই, তবে বিচার দ্রুত শেষ হওয়া এবং আসামির অনুপস্থিতি—দুটোই ন্যায়বিচার নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
থমাস কিন আরও মনে করেন, এই রায়ের পর শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা এখন অত্যন্ত ক্ষীণ। যতদিন তিনি আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ ছাড়বেন না, ততদিন দলটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসাও কঠিন হবে।
সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়ায় একটি বিষয়ই সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে—
ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার প্রয়োজন, কিন্তু সেই ন্যায়বিচার মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্বচ্ছতা, সত্য উদঘাটন এবং মানবাধিকার রক্ষা—এসবই হওয়া উচিত মূল পথ।